২১ ঘণ্টার মারাথন আলোচনা ব্যর্থ — ইসলামাবাদ থেকে খালি হাতে ফিরছেন ভ্যান্স
রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
.
একুশ ঘণ্টা। একটানা একুশ ঘণ্টা ধরে চলল আলোচনা।
বিশ্ব অপেক্ষায় ছিল, তেলের বাজার অপেক্ষায় ছিল, লেবাননের মানুষ অপেক্ষায় ছিল, ইরানের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষগুলো অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু ১১ এপ্রিল শনিবার রাতে ইসলামাবাদ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ালেন, তখন তার মুখে ছিল না কোনো চুক্তির ঘোষণা। ছিল শুধু একটি বাক্য — "আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। "
ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ। তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু। বিশ্বের জ্বালানি বাজারে ভূমিকম্প। এবং শেষে — একটি ব্যর্থ আলোচনা।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে পুরো শুক্রবার ও শনিবার জুড়ে চলল আলোচনা। দুটি দল আলাদা কক্ষে, মাঝখানে পাকিস্তানি কূটনীতিকরা প্রস্তাব বহন করছেন। বাইরের পৃথিবীকে একটি তথ্যও দেওয়া হয়নি। একুশ ঘণ্টা পৃথিবী অন্ধকারে।
তারপর ভ্যান্স সামনে এলেন। বললেন, "এটা ভালো খবর যে আমরা একুশ ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেছি এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা হয়েছে।" কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন, "খারাপ খবর হলো আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। এবং আমার মনে হয় এই ব্যর্থতা আমেরিকার চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ।
সেই শেষ কথাটুকুতেই লুকিয়ে আছে সব — একটি হুমকি, একটি সতর্কবার্তা, এবং একটি প্রশ্ন। ভ্যান্স স্পষ্ট করলেন, আলোচনা ভাঙার মূল কারণ পারমাণবিক প্রশ্ন। আমেরিকা চায় ইরান সুস্পষ্ট ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিশ্রুতি দিক যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এবং যেসব সরঞ্জাম বা প্রযুক্তি দিয়ে দ্রুত পারমাণবিক বোমা বানানো সম্ভব সেগুলোও সংগ্রহ করবে না। ভ্যান্সের কথায়, "এটাই প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য। এটাই আমরা এই আলোচনায় অর্জন করতে চেয়েছিলাম।" ইরান সেই প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়নি।
ইরানের দাবির তালিকাও সুদীর্ঘ। হরমুজ প্রণালিতে সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কোনো সীমাবদ্ধতা নয়। এবং যুদ্ধে যে ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ। আমেরিকার দাবি ঠিক বিপরীত দিকে — হরমুজ অবাধ খুলে দাও, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করো, তেলের পথ মুক্ত রাখো।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হবে ২২ এপ্রিল। আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ভ্যান্স বলেছেন, আমেরিকা "খালি হাতে" ফিরছে। ট্রাম্প আগেই বলে রেখেছিলেন — চুক্তি না হলে "শেষ করে দেব।" এখন প্রশ্ন হলো, ২২ এপ্রিলের পরে কী হবে?
পারমাণবিক প্রশ্নে ইরান অনড়। হরমুজ প্রশ্নে ইরান নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত। ইরান বারবার বলছে, লেবানন সংকটের সমাধান না হলে কোনো চুক্তিই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভ্যান্সের শেষ কথাটা মনে রাখা দরকার — "এটা ইরানের জন্য আমেরিকার চেয়ে বেশি খারাপ।" এই বাক্যে যে হুমকি আছে, তা পরিষ্কার। ২২ এপ্রিলের পরে সেই হুমকি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, সেটাই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইসলামাবাদ চেষ্টা করেছিল। একুশ ঘণ্টা দুটি পক্ষ একই ছাদের নিচে বসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শব্দগুলো মিলল না, সংখ্যাগুলো মিলল না, আর বিশ্বাসটা তো আগে থেকেই নেই। পৃথিবী আবার অপেক্ষায়। এবারে অপেক্ষার রং একটু বেশি গাঢ়।