শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
ফিলাডেলফিয়ায় গুলিতে নিহত ডা. মাহফুজুল হক; জানাজা সম্পন্ন, দাফন হবে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। জীবিকার তাগিদে ডোরড্যাশে কাজ, এক রাতেই শেষ হয়ে গেল সব স্বপ্ন; নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কিত প্রবাসী বাংলাদেশিরা জীবন বাঁচাতে নয়, জীবিকা অর্জনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় ডোরড্যাশে খাবার সরবরাহ করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার ভেড়িবাজারের কৃতী সন্তান, গোমস্তাপুর খোশালপাড়া নিবাসী বিশিষ্ট শিক্ষক মরহুম মোজাম্মেল হক (বাঘু মাস্টার) স্যারের একমাত্র ছেলে, বাংলাদেশি চক্ষু চিকিৎসক ও কানাডার নাগরিক ডা. মো. মাহফুজুল হক (৪৩)। মঙ্গলবার রাতে ফিলাডেলফিয়ার কিংসেসিং এলাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, রাত সাড়ে ৯টার দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর গাড়ি, DoorDash-এর ডেলিভারি ব্যাগ এবং রাইফেলের দুটি ব্যবহৃত খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছেন। হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে একজন চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন গড়ে তোলা ডা. মাহফুজুল হক উন্নত ভবিষ্যতের আশায় উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমান। কানাডার নাগরিক হলেও পরিবারের ভবিষ্যৎ আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বিভিন্ন পেশার পাশাপাশি ডোরড্যাশে খাবার সরবরাহের কাজও করছিলেন। তাঁর স্ত্রীও চিকিৎসক; মাত্র আট মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁদের ১৪ বছর বয়সী এক সন্তান রয়েছে।
স্বজনদের ভাষ্য, পরিবারকে আরও নিরাপদ ও সুন্দর জীবন উপহার দিতেই অতিরিক্ত সময় কাজ করতেন ডা. মাহফুজুল হক। কিন্তু সেই সংগ্রামই শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত হয়েছে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে বসবাসরত স্বজনরা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি। দীর্ঘদিন তিনি আল-শাম উইলো গ্রোভ রেস্টুরেন্টে কর্মরত ছিলেন। সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে তিনি ছিলেন বিনয়ী, সৎ, পরিশ্রমী এবং মানবিক একজন মানুষ। তাঁর অকাল মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বন্যা বইছে। বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও কমিউনিটি সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
বৃহস্পতিবার নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়ার টাইসন মসজিদে বাদ যোহর তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি জানাজায় অংশ নিয়ে শেষ বিদায় জানান। পরে তাঁর মরদেহ দাফনের জন্য কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে পাঠানো হয়। সেখানেই, পরিবারের সদস্যদের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
এদিকে, এ হত্যাকাণ্ডের পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় খাবার ও পণ্য সরবরাহকারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে। কমিউনিটির নেতারা দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
একজন চিকিৎসক, একজন স্নেহময় বাবা, একজন স্বামী এবং একজন সংগ্রামী প্রবাসীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল—স্বপ্নের দেশে জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া অনেক মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলছে।
মোহাম্মদ আলম
ফিলাডেলফিয়া ।