নিউইয়র্কে ভোট প্রতি ১৫ ডলারের কাছে ৬৫ ডলারের পরাজয়
শনিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৫
.
নিউইয়র্ক সিটির সাম্প্রতিক মেয়র নির্বাচনে জোহারান মামদানির নির্ধারক ও ঐতিহাসিক বিজয় শুধু ভোটের ব্যবধানে নয়, পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও আলোচনায়। সিটির প্রথম দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।
দুই মিলিয়নের বেশি ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নেন, যা প্রায় ছয় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ৩৯ শতাংশের অংশগ্রহণ সিটির রাজনৈতিক তাপমাত্রাকে আরও প্রকট করে তোলে।
মামদানি যেখানে তরুণ ভোটার, দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী, কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়, ব্রংক্সের বহু এলাকা, লাতিনো সংখ্যাগরিষ্ঠ পাড়া, নিম্ন–আয়ের পরিবার এবং বিশেষভাবে পাবলিক হাউজিং–এ বসবাসকারী মানুষের ব্যাপক সমর্থন পান, সেখানে কুয়োমো প্রাইমারির পর যে আশা করেছিলেন, তা ভেঙে পড়ে সাধারণ নির্বাচনের রাতেই। ব্রুকলিন, কুইন্স ও ব্রংক্সের বহু এলাকা—বিশেষত পার্কচেস্টার, ওয়েস্টচেস্টার স্কোয়ার, ফ্ল্যাটল্যান্ডস, ইডেনওয়াল্ড ও সাউথ ওজোন পার্কের উল্লেখযোগ্য সরে আসা ভোট মামদানির জয়ের ভিত আরো মজবুত করে।
একই সময়ে কুয়োমোকে ঘিরে বিশাল অঙ্কের নির্বাচনী ব্যয় প্রশ্ন তোলে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। নির্বাচনের আগের কয়েক সপ্তাহে শহরের প্রভাবশালী ধনিকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত স্বাধীন ব্যয়কারী কমিটিগুলো কুয়োমোর পক্ষে ও মামদানির বিরুদ্ধে খরচ করেছে ৫৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মাত্র ৮ লাখ ৫৫ হাজারের কম ভোট পেয়ে কুয়োমোর ভোটপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ ডলার। অন্যদিকে মামদানি–সমর্থিত সংস্থাগুলোর মোট ব্যয় ছিল মাত্র ১৬ মিলিয়ন ডলার, যেখানে তার ভোটপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় মাত্র ১৫ ডলারের কিছু বেশি—এবং সেই ব্যয়ই তাকে বিজয়ের সিঁড়িতে তুলে দেয়।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে কুয়োমোপন্থী একটি গোষ্ঠী যে আক্রমণাত্মক ভিডিও প্রকাশ করে, তা শহরজুড়ে বিতর্কের ঝড় তোলে। মামদানির হাসিমুখের পেছনে জ্বলন্ত টুইন টাওয়ারের ছবি ব্যবহার করে বানানো বিজ্ঞাপনকে ইসলামবিদ্বেষী ও বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যা দেন বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পরামর্শকেরা। মামদানির বয়স তখন ছিল মাত্র নয়; তবুও তাকে ৯/১১ হামলার আবহের সঙ্গে যুক্ত করে আক্রমণ চালানোকে অনেকেই ঘৃণা উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন। শহরের বহু ইহুদি ও মুসলিম নেতারাও এই প্রচারণা নিন্দা করেন, কারণ তাদের মতে, ৯/১১–এর মতো করুণ ঘটনা ব্যবহার করে কোনো সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানানো নৈতিকভাবে নিন্দনীয়ই নয়, সামাজিকভাবে বিপজ্জনকও।
তবে সব নেতিবাচক বিজ্ঞাপন ব্যর্থ হয়নি। বিশেষত রাতে ফাঁকা সাবওয়ে স্টেশনের দৃশ্য দেখিয়ে বানানো বিজ্ঞাপন—যেখানে ভয়, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে পুলিশের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর মামদানির প্রস্তাবকে আক্রমণ করা হয়—তা কিছু এলাকায় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কুইন্স ও ব্রংক্সের কয়েকটি পাড়ায় কুয়োমো যে কিছুটা সুবিধা পান, সে ক্ষেত্রে এসব প্রচারণার ভূমিকা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবু সবশেষে জনগণ তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ এশীয়, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, তরুণ, নিম্ন–আয়ের ও পাবলিক হাউজিং–বাসী নিউইয়র্কারদের ভোটে স্পষ্ট বার্তা—সিটি পরিবর্তন চায় নতুন নেতৃত্ব, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং এমন রাজনীতি যেখানে কোটি কোটি ডলারের আক্রমণাত্মক প্রচারণা নয়, গুরুত্ব পাবে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। জোহারান মামদানির বিজয় একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন। এটি নিউইয়র্ক সিটির জনমতের নতুন গণনা, যেখানে অর্থ নয়, মানুষের আস্থা শেষ পর্বের বিজয় নির্ধারণ করেছে।