এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন — চুক্তি না হলে রাত ৮টার (ইস্টার্ন সময়) মধ্যে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতুগুলো ধ্বংস করা হবে এবং "একটি পুরো সভ্যতা আজ রাতে মারা যাবে। "
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ করেন এবং একই সাথে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে আহ্বান জানান। শরিফের এই সক্রিয় মধ্যস্থতাই মূলত এই যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, হামলা বন্ধ হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান বন্ধ রাখবে। দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০-দফা পরিকল্পনাকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এই চুক্তিকে ইরানের "বিজয়" বলে উল্লেখ করেছে।
"শত্রুর আত্মসমর্পণ যদি আলোচনায় রাজনৈতিক সাফল্যে পরিণত হয়, তাহলে আমরা একসাথে এই ঐতিহাসিক বিজয় উদযাপন করব। অন্যথায় আমাদের সকল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।" — ( ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি)
তবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয় — বরং আলোচনার একটি সুযোগ। পরিষদের বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, "আমাদের হাত ট্রিগারে রয়েছে এবং শত্রুপক্ষের সামান্যতম ভুলের জবাব পূর্ণশক্তিতে দেওয়া হবে।"
ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি অনুযায়ী, আলোচনা শুক্রবার ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে শুরু হবে। ইরানের ১০-দফা শান্তি পরিকল্পনাকে ভিত্তি ধরে এই আলোচনা পরিচালিত হবে। দুই সপ্তাহের এই সময়সীমা উভয় পক্ষের সম্মতিতে বাড়ানো যাবে। তবে ইরান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি "সম্পূর্ণ অবিশ্বাস" প্রকাশ করেছে।
ইসরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধবিরতিতে প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ইসরায়েলি মিডিয়ায় এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে। উল্লেখ্য, ইসরায়েল বরাবরই ইরানের সাথে যেকোনো আলোচনার বিরুদ্ধে ছিল।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাত মিসাইল হামলার মুখে পড়ে। আমিরাতের জাতীয় জরুরি বিভাগ জানায়, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, ইরান থেকে তাদের দেশ লক্ষ্য করে মিসাইল ছোড়া হয়েছে।
লেবাননের পরিস্থিতিও অস্পষ্ট — এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
"ইরানের জ্বালানি সম্পদ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা করলে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত করত এবং এখনকার চেয়ে অনেক গুরুতর জ্বালানি সংকট তৈরি হত।"
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের কাছে কোনো ভালো বিকল্প ছিল না। পুরো অঞ্চল এখন নতুন করে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে বাধ্য হবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়ার মধ্যেও যুদ্ধবিরতির এই মুহূর্তটি অঞ্চলের জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম আধঘণ্টার মধ্যে ৯% এরও বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯৬ ডলারে নেমে আসে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন জ্বালানির দাম প্রায় ৩৯% বৃদ্ধি পেয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের প্রায় ২০% তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল, যাকে ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের পর সবচেয়ে বড় বিঘ্ন বলা হচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সর্বোচ্চ প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলারে ওঠেছিল।
ইব্রাহিম চৌধুরী
সিনিয়র সাংবাদিক, নিউইয়র্ক।